লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা

ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির ৮টি সহজ উপায়

ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির উপায়

ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতা বর্তমান সময়ের অন্যতম ট্রেন্ডিং বিষয়। আধুনিক যুগের অতি গতিময় এই সমাজব্যবস্থায় অনেকেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেনা, পিছু পড়ে যায় জীবনের দৌড়ে। মানসিকভাবে ছিটকে পড়ে দূরে বহুদূরে। তারাই ডিপ্রেশনে থাকে, আর এই ডিপ্রেশনের সঠিক নিরাময় না করতে পেরে অনেকেই আত্মহননের পথ বেছে নেয়।

Photo from QuoteFancy

জীবন মোটেই সহজ কোনো জার্নি নয়, এজন্যই বলা হয়, “Life is not a bed of roses”. সমস্যা জটিলতায় মোড়ানো জীবনে খুব সহজেই নেমে আসতে পারে বিষণ্ণতার ছায়া। প্রেমে ব্যর্থতা, রেজাল্ট খারাপ করা, পারিবারিক জটিলতা, স্কুল/কলেজ/ভার্সিটির বন্ধুদের সাথে মনমালিন্য, আপন কারো মৃত্যুশোক, বর্তমান সময়ের সীমাহীন একাকিত্ব ইত্যাদি আরো হাজারটা কারণে বিষণ্ণতা ধীর পায়ে প্রবেশ করে আমাদের জীবনে। আর অল্প সময়েই নিজের পাকাপোক্ত অবস্থানও বানিয়ে নিতে পারে এই মানসিক অস্থিরতা। সম্প্রতি দেশে টিনেজদের মধ্যে আত্মহত্যার পরিমাণ পূর্বের তুলনায় আশংকাজনক হারে বেড়েছে। এজন্য বিশেষজ্ঞরা দায়ী করছেন ডিপ্রেশনকে। এই মরণফাঁদ থেকে আপনজনদের রক্ষা করতে আমাদের উচিত সচেতন হওয়া। সচেতন করা উচিত আমাদের চারপাশের সকলকেই। যাতে ডিপ্রেশনের কবলে পড়ে আর কোনো তাজা প্রাণ হারিয়ে না যায়।

©melanie-wasser-unsplash

কীভাবে বুঝবেন আপনি ডিপ্রেশনে বা বিষণ্ণতায় ভুগছেন কিনা?

  • সারাক্ষণ মন খারাপ থাকা,
  • সব কাজেই অনীহা জাগা,
  • পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া,
  • শারীরিক অবস্থার অবক্ষয়,
  • মনোযোগের অভাব,
  • হতাশাপূর্ণ মনোভাব,
  • নিজেকে ছোট ভাবা,
  • সামান্য ব্যাপারেও মেজাজ খিটখিটে থাকা,
  • মানসিক অস্থিরতা,
  • সর্বোপরি নিজেকে শেষ করে দেওয়ার ইচ্ছা জাগা অর্থাৎ আত্মহত্যা প্রবণতা।

এখানে একটা বিষয় মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, যারা ডিপ্রেশনে ভুগছে তারা সবাই কিন্তু সুইসাইডাল হয় না। আপনার মধ্যে যদি আত্মহত্যা প্রবণতা অথবা নিজেকে কষ্ট দেওয়ার ইচ্ছা নাও থাকে তবুও আপনি ডিপ্রেশনে থাকতে পারেন। এজন্য সাধারণ লক্ষণগুলিও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে দেখুন আপনি কোনোভাবে ডিপ্রেশনে আছেন কিনা।

আপনি বিষণ্ণতায় আছেন, এখন?

বিষণ্ণতায় থাকলে আপনার উচিত ওই বিষয়ে কিছু করা। জ্বর,-সর্দির মতো ডিপ্রেশন নিজে নিজে চলে যাবে না। এজন্য আপনার যেটা করা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেটা হলো একজন ভালো সাইকিয়াট্রিস্টের সাথে দেখা করে সঠিক চিকিৎসা নেওয়া।

এর পাশাপাশি আপনি নিজেই অনেক কাজ করতে পারেন যেগুলো আপনাকে ডিপ্রেশন কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে। প্রথমেই জেনে নিন ডিপ্রেশনের কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান নেই। এটা একটা দীর্ঘমেয়াদী শ্রমসাধ্য কাজ যেটা আপনাকে নিয়মিত করে যেতে হবে। একসময় আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন আপনি আর আগের মতো ডিপ্রেশনে নেই।

Photo from Lekhmart

কীভাবে ডিপ্রেশনের সাথে লড়াই করবেন?

সবাই নিজেদের মতো করে ডিপ্রেশনের সাথে ফাইট করে। কেউ কেউ অন্যের সাহায্য নেয় আবার কেউ নিজেই নিজের সাহায্য করে। আপনি যদি নিজেই নিজের বিষণ্ণতা কাটিয়ে উঠতে পারেন তাহলে খুব ভালো, কিন্তু অনেক গুলো সহজ উপায় আছে ডিপ্রেশনের সাথে লড়াই করার। সেগুলোর কয়েকটা নিয়ে আমি নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করছি-

১. নিজের ডিপ্রেশন নিয়ে লিখুন

©nils-stahl-unsplash

আপনি কী ভাবছেন আর কেনো ভাবছেন তার সবটা লিখে ফেলুন। নিজের পার্সোনাল ডায়েরিতে এসব লিখে নিজের কাছেই স্বীকার করুন আপনার মনের অভ্যন্তরে বয়ে চলা এই ঝড়ের কথা। অনেক গুলো গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে ডিপ্রেশন নিয়ে বিস্তারিত লেখালেখি করলে ডিপ্রেশনের সাথে লড়াই করা সহজ হয়।

২. পুরোনো বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ বাড়ান

যদিও আপনি ঘরে একা একা বসে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন, ঘর থেকে বেরিয়ে কারো সাথে মেশার ইচ্ছেটাও নেই আপনার। তবুও আপনার উচিত নিজের ছোটবেলার বন্ধুবান্ধবদের সাথে আবার যোগাযোগ করা, তাদের সাথে কথোপকথন আপনার পুরোনো আনন্দের অনুভূতি গুলো ফিরিয়ে আনবে ৷ নিজের প্রতি পূণরায় কিছুটা ভালো লাগা তৈরি হবে।

৩. মজার কিছু দেখুন, করুন

আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন, হাসি সর্বোত্তম চিকিৎসা। শুনে হাসির মনে হলেও এটা আসলে অনেকাংশেই সত্যি। চিত্তবিনোদন আপনার বিষণ্ণতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে। ফানি মুভি দেখুন, স্ট্যান্ড-আপ কমেডি দেখুন, যেটা করে আপনার মজা লাগে সেটাই করুন। হাসি এন্ডোর্ফিন রিলিজ করে স্ট্রেস হরমোন কমিয়ে দেয়। এতে আপনি বিষণ্ণতাবোধ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন খুব সহজে।

৪. শারীরিক পরিশ্রম করুন

©kate-trifo-unsplash

অনেকসময় খুব সাধারণ কোনো সমাধানই যোগ্য সমাধান হিসেনে স্বীকৃত হয়। ঠিক তেমনি ভাবে খুব সাধারণ শারীরিক ব্যায়াম আপনার শারীরিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করবে। এক্সারসাইজ আপনার মধ্যে কর্মদ্দীপনা বাড়ায়, কঠোর এক্সারসাইজ করে যে শারীরিক পরিবর্তন আপনি নিজের মধ্যে দেখবেন সেটা আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেবে। সুঠাম দেহী সুস্বাস্থ্যের অধিকারী মানুষরা বিষণ্নতায় ভুগেন না।

৫. সঠিক খাদ্যাভ্যাস তৈরি করুন

সঠিক খাদ্যাভ্যাস তৈরি করুন

সঠিক খাবার আপনার শারীরিক ও মানসিক উভয় অবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে। কিছু কিছু খাবার আছে যেগুলো ডিপ্রেশন কাটিয়ে উঠতে অনেক সাহায্য করে। আপনি সুষম খাদ্যতালিকা বানিয়ে সেটা ফলো করতে পারেন কিন্তু জেনে আশ্চর্য হবেন কয়েকটা খাবার তাৎক্ষণিকভাবে ডিপ্রেশন দূর করতে পারে, যেমন চকোলেট সেরোটোনিন বুস্ট করে আমাদের মধ্যে হাসিখুশির অনুভূতি তৈরি করে। এছাড়া চা, কফিও বেশ ভালো বিষণ্নতার অনুভূতি কাটানোর জন্য।

৬. বই পড়ুন

©atlas-kadrow-unsplash

ভালো বই আমাদের মন ভালো করে দেয়। তাই যেসব বই পড়ে আপনার ভালো লাগে বিষণ্নতার সময় আপনি সেগুলো পড়ে দেখতে পারেন। এছাড়াও ভালো ভালো মোটিভেশনাল বই যেগুলো আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেবে সেগুলো পড়বেন। স্পেসিফিকেলি কিছু বই আছে যেগুলো ডিপ্রেশনকে টার্গেট করেই লেখা সেগুলোতে দেওয়া থাকে কীভাবে মুড চেইঞ্জ করবেন, ডিপ্রেশনের সাথে মানিয়ে নেবেন আর জয় করবেন এই জীবনঘাতি ব্যাধিকে।

৭. মেডিটেশন এবং ইয়োগা প্র‍্যাকটিস করুন

©kike-vega-unsplash

নিজের মানসিক ও শারীরিক উন্নতির জন্য মেডিটেশন ও ইয়োগা সবচেয়ে পুরোনো এবং কার্যকরী উপায়গুলোর অন্যতম। মেডিটেশনের উদ্দেশ্য হলো মনের অভ্যন্তরীণ প্রশান্তির সন্ধান করা। আর ইয়োগা হলো গতিময় মেডিটেশন যেটা একইসাথে আধ্যাত্মিক এবং দৃশ্যমান উন্নতির একটা পদ্ধতি। ইয়োগা আপনার নিজের প্রতি হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আবার নতুন উদ্যমে নতুন জীবন শুরু করতে সাহায্য করবে।

( এছাড়াও, পড়ুন যোগব্যায়ামের স্বাস্থ্য উপকারিতা )

৮. সামাজিক কাজে অংশ নিন

©USD

বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আমরা অনেক বেশী ভার্চুয়াল। স্ক্রিনের আড়ালে বসে ইন্টারনেটে গল্প করে সময় পার করি। কিন্তু এতে মানসিকভাবে কোনো লাভ তো হয়ই না বরং অনেক ক্ষতি হয়। ডিপ্রেশন কাটাতে স্ক্রিনের আড়াল থেকে বেড়িয়ে এসে মানুষের সাথে সামনা সামনি কথা বলার চেষ্টা করা উচিত। নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হবে বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে। জনসম্মুখে কথা বলার জড়তা কাটানোর চেষ্টা করতে হবে। আপনি এভাবে নিজেকে সামাজিক কাজে জড়িয়ে সমাজের জন্য খুব ভালো কিছু করতে পারেন। এটা আপনার ব্যক্তিগত জীবনেও অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তখন নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হবে আপনার।

ডিপ্রেশন একটি নিরাময়যোগ্য মানসিক ব্যাধি। একাকিত্বের বোঝা নিয়ে এই রোগে ভুগে নিজেকে শেষ করে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। তাই যখনই মনে হবে আপনি বিষণ্নতায় ভুগছেন তৎক্ষনাৎ আপন মানুষদের সাথে বিষয়টি শেয়ার করুন, তাদের আপনার মানসিক অবস্থা জানান। যদি ডিপ্রেশনের মাত্রা বেশি হয়, তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন। জীবন একটাই, এটাকে সুন্দর রাখুন, সুখী জীবন-যাপন করুন। সাহায্য নিন, অন্যের সাহায্যে হাত বাড়িয়ে দিন। সবাই মিলে ডিপ্রেশনের সাথে লড়াই করে আমরা অবশ্যই জিতবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Bengali BN English EN Hindi HI