ইতিহাস

মিশরীয় রাণী নেফারতিতি জীবনের গল্প

নেফারতিতি

সভ্যতার বিচারে মিশর সভ্যতা পৃথিবীর ইতিহাসে সবচাইতে প্রভাবশালী ও উৎকর্ষ মন্ডিত সভ্যতার একটি। ইতিহাস, ঐতিহ্য, বিজ্ঞান, স্থাপত্য, জ্যোতিষবিদ্যা সবক্ষেত্রেই এগিয়ে ছিল মিশর সভ্যতা। আর এই মিশরীয় সভ্যতা ও ইতিহাস নিয়ে যাদের আগ্রহ আছে তাদের কাছে নেফারতিতি নামটি অপরিচিত নয়। তাকে বলা হয় মিশরের ইতিহাসে সবথেকে সুন্দরী ও ক্ষমতাবান নারী। পুরো নাম নেফের-নেফেরু আটন সম্মান দেখানোর জন্য আটন যুক্ত হয়েছিল। আর তার নামের অর্থ ছিল “সুন্দরী এসেছেন”। তার স্বামী ছিলেন রাজা আখেনাটেন যার রাজত্বকাল ছিল খ্রিস্টপূর্ব ১৩৫৩-১৩৩৬. তিনি পূর্বে আমেনহোতেপ IV নামে পরিচিত ছিলেন। রহস্যাবৃত নেফারতিতিকে অসংখ্য নামে উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল তাকে নীলনদের প্রশাসক, ঈশ্বরের কন্যা নামে ডাকা হতো। তিনি তাঁর দীর্ঘকায় গলার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। বিভিন্ন উদ্ভিদ ব্যবহার করে সাজসজ্জা করতেন। প্রাচীন মিশরের রানী নেফারতিতিকে ভালোবাসা আনন্দ-উৎসবের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

নেফারতিতি জন্ম

ধারণা করা হয় নেফারতিতির জন্ম খ্রিস্টপূর্ব ১৩৭০, আর ১৩৩০ খ্রিস্টপূর্বে তার মৃত্যু হয়। নেফারতিতির বাবা-মায়ের সঠিক কোনো পরিচয় পাওয়া যায়না। মনে করা হয় রাজার জন্য সংরক্ষিত হেরেমে বেড়ে উঠেছিলেন নেফারতিতি। কিছু ঐতিহাসিকের মতে নেফারতিতি আখমিম শহর থেকে এসেছিলেন, আর সেখানকার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ‘আই’ এর কন্যা অথবা ভাইয়ের কন্যা ছিলেন। আবার কিছু ঐতিহাসিক দলিল অনুসারে বলা যায় তিনি সিরিয়া থেকে এসেছিলেন।

নেফারতিতি জীবনের গল্প

নেফারতিতির’ জীবনের আকর্ষণীয় গল্প

শৈশবেই রাজকুমার চতুর্থ আমেনহোতেপ সাথে দেখা হয়। নেফারতিতির ১৫ বছর বয়সে তার সাথে বিয়ে হয়। ফারাও সম্রাটের মৃত্যুর পর তার স্বামীর সাথে সিংহাসন আরোহন করেন। কিছু প্রাচীন শিলালিপি থেকে জানা যায় শৈশব থেকেই সূর্যদেবতা আতনের অনুরক্ত ছিলেন। তিনি তার স্বামীকে প্ররোচিত করে সূর্য দেবতার অনুসারী বানিয়ে ফেলেন। তার স্বামী নিজের নাম পরিবর্তন করে নাম রাখেন আখেনাতেন। তারা দুজন মিলে মিশরের জাতীয় ধর্ম পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন। বহুকাল ধরে চলে আসা বহু দেবতার উপাসনা সংস্কৃতি বাতিল করে দেন তারা। তৎকালীন মিশরীয়রা একাধিক দেবদেবীর প্রতি উপাসনা করতো। এই ধারা পরিবর্তন করে নেফারতিতি ও তার স্বামী দেবতা আতন বা সূর্য দেবতার পূজা চালু করেন। এই সিদ্ধান্ত প্রকৃতপক্ষে একেশ্বরবাদ সৃষ্টির প্রাথমিক ধাপ হিসেবে ধারণা করা হয়। বাকি দেবতাদের মন্দিরে তালা লাগিয়ে সূর্য দেবতাকে একক দেবতা হিসেবে ঘোষণা করাটা তৎকালীন মিশরের জনগণের তেমন একটা অপছন্দ হয়নি কারণ তারা সূর্যকে তাদের সৃষ্টির দেবতা হিসেবে মানতো। আতন দেবতার উপাসনা ছিল একটু অন্যরকম। এই দেবতার উপাসনা করা হতো সূর্যের আলোতে দিনের বেলায়। কিন্তু এর আগে কোন দেবতার উপাসনা করা হতো অন্ধকার মন্দিরে যেখানে রহস্যময় কায়দায় পুরোহিতরা উপাসনা ব্যস্ত থাকতেন। সাধারণ মানুষের সাথে তেমন যোগাযোগ ছিল না। এই ধরনের উপাসনার নতুন নতুন নিয়ম সৃষ্টির ফলে মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে শুরু করলো। পুরোহিতদের গুরুত্ব কমে গেল। উপাসনার জন্য পুরোহিতরা জনগণ থেকে যে অর্থ পেতেন সেই পথ বন্ধ হয়ে গেল। অন্যান্য মন্দিরগুলোর সকল জৌলুস হারিয়ে গেল। নানা প্রান্তে অন্যসকল দেবদেবীর মূর্তি অপসারিত হলো। তিন হাজার বছরের পুরাতন ধর্ম নিমিষে হারিয়ে গেল। যেসব পুরোহিতরা বিরোধিতা করেছিলেন তাদের সবাইকে কারারুদ্ধ করা হলো, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হলো, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হলো। রয়ে গেল শুধু এক ঈশ্বর অর্থাৎ সূর্য দেবতা। এসব কারণে একসময়ের ক্ষমতাধর পুরোহিতদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হলো যা পরবর্তীতে প্রকাশ পেয়েছিল। নেফারতিতির আমলে রানীর জন্য ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয় রাজ্যসভায়, সেখানে নারীর রানীর জন্য আলাদা কোন আসন ছিল না আর যদিও থাকতো সেটি হতো রাজা তুলনায় অনেক ছোট এবং পেছনে। রাজা আখেনাতেন নিজের পাশে রানী সিংহাসনে ব্যবস্থা করেন। একই সাথে সমপর্যায়ের সিংহাসনে বসে রাজ্য পরিচালনা করেন। এটাই প্রমাণ করে নেফারতিতির ক্ষমতা একজন ফারাও রাজার মত ছিল। অনেকের ধারণা আখেনাতেন যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তার বেশিরভাগই আসলে নেফারতিতি দেওয়া। নেফারতিতি ও রাজা আখেনাটেন প্রাক্তন রাজাদের প্রটোকল ভুলে এক অভিনব বিনোদনের ব্যবস্থা করেন যেখানে একটি ঘোড়দৌড়ের আয়োজন করা হয়। যেখানে রাজা ও রানী একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই প্রতিযোগিতায় নেফারতিতিই বেশিরভাগ সময় বিজেতা।

স্বামীর রাজত্বে অসাধারণ ক্ষমতা প্রয়োগ করেছিলেন নেফারতিতি। মিসরের ইতিহাসে সবথেকে সমৃদ্ধশালী সময়ে রাজত্ব করেছিলেন নেফারতিতি ও তার স্বামী। তৎকালীন ফারাও রাজার সমান মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল রানীকে। উপাসনালয়ের দেয়ালে সম্রাটের ছবি যতটুকু জায়গা জুড়ে থাকতো রানীর ছবি ও ঠিক কতটা জায়গা জুড়ে থাকতো। মন্দিরের প্রবেশ পথে আছে পাশের দেয়ালে পাথরের ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রায় শ’খানেক চিত্রলিপি পাওয়া যায়, এইসব লিপিতে নেফারতিতিকে দেখা গেছে শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠানগুলো পরিচালনা করতে, যেগুলো পরিচালনার ক্ষমতা সাধারণত ফারাওদের হাতে ছিল। সেজন্যই ধারণা করা হয় তিনি নিজেকে দেবীর পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। আবার এমন কিছু চিত্র পাওয়া যায় যেখানে নেফারতিতি রথে চড়ে একটি শাস্ত্র উঁচিয়ে ধরে আছেন, এ থেকে ঐতিহাসিকরা ধারণা করেন তিনি ছিলেন রাজার পরে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। সব মিলিয়ে তার সম্পর্কে যতটুকু জানা যায় তিনি নিজেকে মিশরের অধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যা তখন পর্যন্ত মিসরের ইতিহাসে কোন নারী করতে পারেননি।

কিন্তু নেফারতিতির এই সমৃদ্ধ সময়ের স্থায়িত্বকাল হয়েছিল মাত্র ১৪ বছর। ক্ষমতায় আরোহনের ১৪ বছরের মাথায় রাজা আখেনাতেন মারা যান। ধারণা করা হয় এরপর নেফারতিতি ক্ষমতায় বসেন কিন্তু তার দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। রাজার মৃত্যুর পর পুরোহিতরা সমগ্র মিশরকে আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যান। সূর্য দেবতার বিদায় হয়, আবার পুরোদমে শুরু হয় অন্যান্য দেবতাদের পূজা। রাজার মৃত্যুর পর থেকে নেফারতিতির আর খোঁজ পাওয়া যায়না। একেবারে হাওয়া মিলিয়ে যান তিনি।

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন নেফারতিতির এই অন্তর্ধান একটি পরিকল্পিত ঘটনা। তিনি হয়তো প্লেগে মারা যান কিন্তু নেফারতিতির মমি পুরোহিতরা এমন জায়গায় সময় তো করেছেন যেখান থেকে তাকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আবার কেউ বলেন ফারাও রাজা আখেনাতেন এর মৃত্যুর পর রানী নেফারতিতি পুরুষের ছদ্মবেশ ধারণ করেন পরবর্তী রাজা তুতেনখামেন প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। নেফারতিতির কিছু রাজমুকুট পরিহিত ছবি এই ধারণাটিকে শক্ত করেছে।

আরেকদল ঐতিহাসিক এই সকল ধারণাকে নাকচ করে দিয়ে বলেন আখেনাতেন এর মৃত্যুর পর পূর্ববর্তী দেবতারা আবার সমাজের জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং অজ্ঞাত নির্বাসনে পাঠানো হয় নেফারতিতিকে। সবচেয়ে রহস্যের বিষয়ে এখন পর্যন্ত এই যে পরাক্রমশালী এই নারীর মমি এখনো রহস্যই থেকে গেছে। অনেক ঐতিহাসিক ও গবেষক তাকে নিয়ে গবেষণা করছেন। এই রহস্য আরো বেশি রহস্যময় হয়েছে, যখন ধারণা করা হয় কিশোর রাজা তুতেনখামেন সিংহাসনে বসে তিনি তার পিতা আখেনাতেন ও তার স্ত্রী নেফারতিতির গড়া সমস্ত স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস করে দেন। নেফারতিতির মমি খুঁজে না পাওয়ার পেছনে হয়তো তুতেনখামেনই দায়ী। নেফারতিতির সাথে যাই ঘটুক এ কথা সত্যি তার স্মৃতি চিহ্নকে কে বা কারা যেন মুছে দিতে চেয়েছিল। সমস্ত অঙ্কিত ছবি দেয়ালগুলো থেকে তুলে ফেলা হয়েছিল। নেফারতিতির চিহ্ন আছে এমন সকল কিছুই ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছিল।

এই মুছে যাওয়া ইতিহাসের নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে যখন ব্রিটিশ এন্থলজিস্ট নিকোলাস রিভস তুতেনখামেনের সমাধি দেয়ালের স্ক্যান করার ছবি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে সেখানে গোপন দরজার নকশা দেখতে পান। পরে দেখা যায় উক্ত দেয়ালের পাশে একটি ফাঁকা জায়গা রয়েছে যা আলাদা কোন কক্ষ হতে পারে। তুতেনখামেনের সমাধিস্থলেই হয়তো নেফারতিতির মূর্তি পাওয়া যাবে এমনটা ধারণা করা হচ্ছিল। এরকম অনেক প্রশ্নের জন্য এখনো এক ঘনীভূত রহস্য হয়ে আছে নেফারতিতি অধ্যায়। এসব প্রশ্নের উত্তরে আশায় চলছে নিরলস গবেষণা আর বাড়ছে অনুসন্ধানী মনের অনুসন্ধিৎসা।

উপরের এতো এতো রহস্যের মাঝেও সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, ১৯১২ সালের আগে নেফারতিতিকে কেউ চিনতো না। ১৯১২ সালের ৬ ডিসেম্বর জার্মানির একটি খননকারী দল প্রায় ৩২০০ বছরের পুরনো একটি নারী প্রতিমূর্তির খুঁজে পায়, এই মূর্তিটি ২০ ইঞ্চির মতো লম্বা ছিল, গবেষণায় বেরিয়ে আসে এটি রানী নেফারতিতির প্রতিমূর্তি। সেই প্রতিমূর্তিটি এখন অল্টেস মিউজিয়াম, বার্লিনে রাখা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Bengali BN English EN Hindi HI