ইতিহাস

মুর্শিদাবাদের হাজারদুয়ারি প্রাসাদ

হাজারদুয়ারি প্রাসাদ

হাজারদুয়ারি প্রাসাদ অবিভক্ত বাংলার এক অনন্য ঐতিহাসিক নিদর্শন। নবাবী আমলের স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের উজ্জ্বল প্রতীক হাজারদুয়ারি প্রাসাদ। এর অবস্থান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুর্শিদাবাদ জেলার লালবাগ নামক জায়গায়। এই প্রাসাদটি প্রায় এক হাজার দরজা বিশিষ্ট হওয়ার কারণে এটিকে হাজারদুয়ারি প্রাসাদ বলা হয়। হাজারদুয়ারি প্রাসাদ গঙ্গার উত্তর পাড়ে অবস্থিত আর ঠিক পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ভাগীরথী নদী।

অনেকে ধারণা করেন এই প্রাসাদটি তৈরি করেছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে সিরাজউদ্দৌলার মৃত্যুর প্রায় ৮০ বছর পর মীরজাফরের বংশধর নবাব হুমায়ুনজা এটি নির্মাণ করেন। এখানে উল্লেখ্য যে সিরাজউদ্দৌলার প্রাসাদের নাম ছিল হিরাঝিল, যেটি কালের বিবর্তনে ভাগীরথী নদীতে বিলীন হয়ে যায়। নবাব হুমায়ুনজা ১৮২৯ সালে হাজারদুয়ারি প্রাসাদের নির্মাণ কাজ শুরু করেন, এই কাজ আট বছর ধরে চলে হাজার ১৮৩৭ সালে শেষ হয়।

নবাব হুমায়ুনজা ইতালীয় শৈলীতে এই প্রাসাদ নির্মাণ করেন। তৎকালীন সময়ে প্রায় ১৮ লক্ষ টাকা ব্যয় করে নির্মাণ করা হয় তিনতলা উচ্চতা বিশিষ্ট এই প্রাসাদ। প্রাসাদটির মূল স্থপতি ছিলেন ডানকান ম্যাকলয়েড আর তার সহযোগী হিসেবে ছিলেন বাঙালি স্থপতি সবুর মিস্ত্রী।

Murshidabad

প্রাসাদের একতলায় বিভিন্ন অফিস ও ঘোড়ার গাড়ি রাখার জায়গা, দোতলায় পাঠাগার দরবার হল ও অতিথিশালা এবং তিন তলায় নবাব ও বেগমদের থাকার জায়গা ছিল। একতলা সামনে আছে একটি বিশাল সিঁড়ি। এই সিঁড়ি প্রাসাদ এর দরবার হল পর্যন্ত উঠে গেছে। প্রাসাদের সামনে সুন্দর নকশার কাজ সম্বলিত গোলাকার স্তম্ভ রয়েছে। সিঁড়ির দুই পাশে ব্রিটিশ রাজ্যের প্রতীক সিংহের প্রতিমূর্তি রয়েছে আর তার পাশে দুটি ছোট সেলামি কামান আছে। তবে এই সব কিছু এখন অতীত, বর্তমানে হাজারদুয়ারি একটা মিউজিয়াম।

হাজারদুয়ারি প্রাসাদ নিয়ে মানুষের কৌতূহলের অন্ত নেই। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মুর্শিদাবাদে আসেন এই প্রাসাদে দেখতে। এই প্রাসাদটিকে অনেকেই নবাবি আমলের শেষ নিদর্শন রূপে বিবেচনা করেন। যখন থেকে নবাব প্রথা বিলুপ্ত হয়ে যায় এরপর দীর্ঘদিন এই প্রাসাদটি অবহেলায় পড়ে ছিল। অবশেষে ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এটিকে অধিগ্রহণ করে এবং সেখানে একটি মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রাসাদটির নিচতলায় অস্ত্রাগারে প্রায় ৭০০ দুর্লভ অস্ত্র রয়েছে। এখানে এমন সব অস্ত্র আছে যেগুলো পলাশীর যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিল। তৎকালীন নবাবদের ব্যবহৃত বিভিন্ন অস্ত্র যেমন তরবারী বহু নল বিশিষ্ট বন্দুক, বিভিন্ন ধরনের কামান, রাইফেল, বিভিন্ন ধরনের ছোরা, এমনকি মোহাম্মদী বেগ তরবারি দিয়ে সিরাজউদ্দৌলা কে হত্যা করেছিলেন সেটিও এখানে আছে। দোতালায় আর্ট গ্যালারি আছে সেখানে গেলে দেখতে পাওয়া যায় মুর্শিদকুলি খানের মার্বেল পাথরের সিংহাসন, সিরাজউদ্দৌলার রুপার পালকি হাতির দাঁতের পালকি, রুপোর পালকি, তখনকার সময়ে বিভিন্ন চীনা মাটির তৈরি আসবাবপত্র, মমি করা বিভিন্ন প্রকারের দুষ্প্রাপ্য পাখি, এছাড়াও দরবারে রয়েছে মহারানী ভিক্টোরিয়ার উপহার দেওয়া ১০১ টি বাতি যুক্ত সুদৃশ্য ঝাড়বাতি। তৃতীয় তলায় লাইব্রেরীতে অনেক ধর্মপুস্তক, তৎকালীন সাহিত্য তাম্রলিপি, ঐতিহাসিক চুক্তিপত্র, প্রয়োজনীয় দলিল দস্তাবেজ, বৈদেশিক ভাষায় গ্রন্থ, সম্রাট আকবরের সভাসদ আবুল ফজলের লেখা আইন-ই-আকবরীর পান্ডুলিপি, বাগদাদের বিখ্যাত লেখক হারুনুর রশিদের নিজ হাতে লেখা কোরআন শরীফের কপি ইত্যাদি দুর্লভ সংগ্রহ আছে। এছাড়াও বিভিন্ন বিখ্যাত শিল্পীদের হাতে আঁকা ছবি আছে এই জাদুঘরে। সব মিলিয়ে এই হাজার দুয়ারি প্রাসাদে প্রায় এক হাজারেরও বেশি দর্শনীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জিনিস রয়েছে।

হাজারদুয়ারি প্রাসাদের ঠিক সামনে অবস্থিত ইমামবাড়া। স্বয়ং নবাব সিরাজউদ্দৌলা এই ইমামবাড়া নির্মাণ করেন। নবাব সিরাজউদ্দৌলার তৈরি স্থাপনার মধ্যে শুধু এই ইমামবাড়া টিকে আছে। নামিদামি বিভিন্ন বস্ত্র দিয়ে এই ইমামবাড়া টিকে অলংকৃত করেছিলেন সিরাজ। নবাবী আমলে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে এই ইমামবাড়া বর্ণিল সাজে সজ্জিত হত। পরবর্তীতে একটি অগ্নিকাণ্ডে এ মসজিদটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মহরমের ১ থেকে ১০ তারিখ পর্যন্ত এই ইমামবাড়া খোলা থাকে আর বছরের অন্য সময় মসজিদ বন্ধ থাকে।

প্রাসাদ আর ইমামবাড়ার মধ্যবর্তীস্থানে অবস্থিত মদিনা মসজিদ। মায়ের ইচ্ছা পূরণের লক্ষ্যে সিরাজউদ্দৌলা কারবালা থেকে মাটি এনে এই গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ টিকে তৈরি করেন। মসজিদের সামনে আছে বাচ্চাওয়ালি কামান। কথিত আছে এই কামানের তোপ দাগার শব্দে কোন গর্ভবতী নারীর প্রসব ঘটে। হাজারদুয়ারি প্রাসাদের সংযুক্ত পথের ঠিক পূর্ব দিকে রয়েছে সুউচ্চ ঘড়িঘর। তৎকালীন সময়ে সাধারণ মানুষ ও নদীতে চলাচলকারি নৌকা ও জলযানের মাঝি ও যাত্রীদের সুবিধার জন্য এই ঘড়িটি নির্মাণ করা হয়।
হাজারদুয়ারী প্রাসাদের চারপাশে রয়েছে একটি সুন্দর ও সুসজ্জিত বাগান, যে বাগানের সৌন্দর্য যে কাউকে মুগ্ধ করে দেয়।

হাজারদুয়ারি প্রাসাদে ভেতরে মোবাইল ফোন কিংবা ক্যামেরা নিয়ে যাওয়া যায় না। কারো সাথে এইসব থাকলে সরকারিভাবে জমা রাখা হয়। প্রাসাদ শুক্রবার ছাড়া বাকি সব দিন খোলা থাকে, ১০ রুপি প্রবেশ মূল্য নির্ধারণ করা আছে।

তৎকালীন নবাবরা বাংলা, বিহার ও ওড়িশার শাসন সমন্বিত ভাবে করতেন তাই এই প্রাসাদ আমাদের বাঙালীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। ইতিহাস ও প্রাচীন ঐতিহ্য সচেতন যেকোনো মানুষ এই হাজারদুয়ারী প্রাসাদের চত্ত্বরে গিয়ে শিকড়ের আভা খুঁজে পাবেন।

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Bengali BN English EN Hindi HI