ইতিহাস

হিপ হপ সংগীতের ইতিহাস

হিপ হপ সংগীতের ইতিহাস

এমিনেমের নাম তো নিশ্চয়ই শুনেছেন? সাধারণ শিল্পীদের থেকে তার গানগুলো কি একটু অন্যরকম মনে হয়না? কিংবা বাংলাদেশে বর্তমানের জনপ্রিয় গালি বয় রানা আর তাবিব মাহবুব এর গানগুলো নিশ্চয়ই শুনেছেন? কেমন যেন একটা অন্যরকম আবেদন আছে না এই গানগুলোতে?
সাধারণ রোমান্টিক গানের তুলনায় এই গানগুলো একটু অন্যরকম স্পিহা তৈরি করে। এগুলোকে র‍্যাপ গান বলা হয়। আর এই র‍্যাপ গান হচ্ছে হিপহপ সংগীতের এর একটা শাখা। কিন্তু অনেকেই মনে করেন র‍্যাপ গানই হয়তো হিপহপ গান। আসলে হিপহপ বলতে শুধু গান নয় একটা পুরো সাংস্কৃতিক আন্দোলন বোঝায়।

হিপহপ মূলত চারটি স্বতন্ত্র ধরাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। তার মধ্যে আছে, র‍্যাপ (মৌখিক ছন্দোবদ্ধ দ্রুত গান), ডিজে (আধুনিক মিউজিক নির্ভর ডিস্কো গান), বিটবক্স (মুখের শব্দ নির্গমন প্রক্রিয়া ব্যবহার করে বানানো মিউজিক) ও গ্রাফিতি (দেয়াল লিখন ও প্রতিবাদী চিত্রকলা)।
আসুন জেনে নেওয়া যাক বিশ্বজুড়ে তোলপাড় করা এই হিপহপ এর সংক্ষেপিত ছোটখাটো ইতিহাস।

হিপহপ শব্দটি সর্বপ্রথম চালু করেন কিথ কাউবয় নামের একজন। কাউবয় তার মঞ্চে পরিবেশিত গানগুলোর মধ্যে এই শব্দটি ব্যবহার করা শুরু করেন। ধীরে ধীরে অন্যান্য শিল্পীরাও এটা ব্যবহার করতে শুরু করেন। কিন্তু হিপহপ এর প্রকৃত অগ্রদূত ছিলেন জ্যামাইকান বংশোদ্ভূত ডিজে ক্লিভ ‘কুল হার্ক’ ক্যাম্পবেল। তিনি তার অত্যন্ত প্রখর বুদ্ধিবৃত্তি ও মিউজিক সেন্স এর মাধ্যমে এমন সব প্রতিবাদী গান আর লিরিক লিখেছিলেন যা হিপহপ মিউজিকের একটা শক্তিশালী বেস তৈরি করে দিয়েছিল। স্টিভেন হ্যাগার নামে একজন লেখক সর্বপ্রথম তার লেখায় এই শব্দটি ব্যবহার করেন যা পরবর্তীতে ভিলেজ বয়েজ নামে একটি পত্রিকায় ছাপা হয়। ১৯৮৪ সালে হিপহপ এর ইতিহাস লেখেন স্টিভেন হ্যাগার। হিপহপের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা ১৯৭০ এর দশকে নিউইয়র্ক সিটিতে শুরু হলেও প্রকৃতভাবে হিপহপ এর উৎস এসেছে আফ্রিকান সংগীত থেকে। পশ্চিম আফ্রিকা একটা গানের দল ছিল যাদের নাম ছিল ‘গ্রিয়টস’, তারা এক প্রকারের ছন্দ গান গাইতো যা অনেকটাই র‍্যাপ গানের মতো ছিল। হিপহপ সংগীত খুব বেশি প্রভাবিত ছিল তৎকালীন সময়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় ডিস্কো সঙ্গীত দ্বারা। হিপহপ গান গুলো প্রাথমিকভাবে আমেরিকাতে খুব বেশি জনপ্রিয়তা না পেলেও পার্শ্ববর্তী জ্যামাইকায় এগুলো অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়। এই ধরনের মিউজিক জনপ্রিয়তার পেছনে আমেরিকান নাবিক এর প্রভাব রয়েছে। সর্বপ্রথম গান হিসেবে রেকর্ড করা হয় ‘র‍্যাপার ডিলাইট’ নামে একটি গান যা ১৯৭৯ সালে ‘সুপারহিল গ্যাংস’ নামে একটা ব্যান্ড কর্তৃক প্রকাশিত হয়। ১৯৮০ সালের পর থেকে হিপহপ সঙ্গীত সারা বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে উঠে। আশির দশকের শেষ আর নব্বই দশকের শুরুকে হিপহপ সংগীতের স্বর্ণযুগ ধরা হতো। এরপর থেকে এই সংগীত শুধু সংগীত না থেকে একটা প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বিশ্বব্যাপী প্রচলিত হয়ে গেছে। একেক দেশে এক এক রকম হলেও হিপহপ তার প্রকৃত উদ্দেশ্যে এখনো বহমান।

সত্যিকার অর্থেই এটিকে বিশ্বব্যাপী মিউজিক্যাল প্যানডেমিক হিসেবে অভিহিত করা যায়। শুরুর দিকে খুব বেশি একটা বাণিজ্যিক বিকাশ না থাকলেও ধীরে ধীরে হিপহপ সংগীত কে ঘিরে বিশ্বব্যাপী শক্তিশালী বাণিজ্যিক মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন সমালোচকরা বলেন 2005 সালের পর থেকে হিপহপ অ্যালবামের বিক্রি কমে গেছে। এটাকে এই ধরনের গানের জনপ্রিয় হ্রাস এর চিত্র হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম ইন্টারনেট ডাউনলোড নির্ভর হয়ে পড়ায় অ্যালবাম বিক্রি অনেকাংশে কমে গেছে। তারপরও অনেক হিপহপ শিল্পী আছেন যারা বাণিজ্যিক জনপ্রিয়তার বিচারে এখনো শীর্ষে অবস্থান করেন।

হিপহপ প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর থেকেই এটি একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে তরুণ সমাজের উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার শুরু করে। বর্তমান যুগে জনগণের সচেতনতা অনেক বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা নিজেদের মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। যেকোনো ধরনের অন্যায় অবিচার নিয়ে আন্দোলন করা এখন বেশ স্বাভাবিক ঘটনা। আর এই আন্দোলনের অন্যতম চালিকাশক্তি হতে পারে হিপহপ। হিপহপ গণমানুষের মধ্যে জোরালো লিখনি সুর আর সংগীতের সংমিশ্রণে যে সংস্কৃতি তৈরি করে তাতে সবাই একত্ব হয়ে যেতে পারে খুব সহজেই। প্রমাণ হিসেবে মিশরের ‘আরব বসন্ত’ অথবা ফ্রান্স, জার্মানি, তুরস্ক কিংবা আলজেরিয়া সহ বিশ্বের নানা প্রান্তে সংখ্যালঘুদের অধিকার আদায়ে হিপহপ এর ভূমিকা সম্পর্কে জেনে নিতে পারেন। আর তাই হিপহপ এর প্রভাব নিয়ে এখন কেউ দ্বিমত পোষণ করেন না।

যেকোনো জিনিসেরই ভালো খারাপ দুটি দিক বিদ্যমান থাকে। ঠিক তেমনি হিপহপ নিয়েও অনেক দ্বন্দ্ব আর বিষেদাগার আছে। দ্রুত মানুষের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে পারে বলে মারাত্মক বিধিনিষেধের মুখোমুখি হতে হয় হিপহপ মিউজিককে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অজুহাতে হিপহপকে নিষিদ্ধ করার ঘটনা খুবই সাধারণ। এ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র দোষ একাই সরকার বহন করেনা হিপহপ এরও সমস্যা আছে। হিপহপ এর একটা উপধারা হচ্ছে গ্যাংস্টা র‍্যাপ, অনেক বেশি আক্রমণাত্মক হয় এই ধরনের গান। অত্যন্ত জঘন্য ভাবে অশ্রাব্য গালি, ধর্মনিন্দা, বিভিন্ন বিতর্কিত বিষয় নিয়ে মন্তব্য, সহিংস জীবনযাত্রা ইত্যাদি প্রমোট করা হয় এসব গানে। এজন্য হিপহপ মিউজিকের সমালোচনা করেন অনেকেই। যদিও গ্যাংস্টা র‍্যাপাররা বলেন যে, এই গানগুলো তাদের জীবনের অংশ, ঘটে যাওয়া সব বাস্তবতা, সত্যিকারের কাহিনীর বর্ণনা মাত্র। তারা শুধু ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন চর্চা করছেন!
এছাড়াও আরো এক ধরনের হিপহপ গান আছে যেগুলোতে শুধু টাকা, নারী, মারামারি আর মাদক নিয়ে গান করা হয়। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, এই ধরনের হিপহপ গানই বর্তমানে বেশি প্রচলিত। আরো আছে কিছু ধর্মবিদ্বেষী গান যেগুলোতে শয়তানের পূজা করা মুখ্য হয়ে ওঠে। এই ধরনের সঙ্গীত সাধারণ মানুষের জন্য যেমন হতে পারে বিপদজনক ঠিক তেমনি একটি অসুস্থ সংস্কৃতির পরিচায়ক। নিজের বিবেক বুদ্ধি খরচ করে কোন দিকে যাবেন তা নির্ধারণ করে নেওয়া উচিত।

কিছু ভালো ভালো হিপহপ স্রষ্টার নাম না নিলে এই লেখাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আমার ব্যক্তিগত পছন্দের কিছু শিল্পীর নাম নিচে দিয়ে দিচ্ছি, যারা নারী, গাড়ি, মাদক, টাকা আর সন্ত্রাস বাদ দিয়েও আলাদা একটি জনপ্রিয় ধারা তৈরি করেছেন।
সবার আগে নাম নিতে হবে বব মার্লের, তিনি জ্যামাইকায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বিখ্যাত রেগে সংগীতের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তি ছিলেন তিনি। তার ভক্তের সংখ্যা এখনো অগণিত। এরপর আসবে এমিনেম, সর্বকালের সেরা রেপার হিসেবে অনেকে তার নাম নেন। বর্তমানে অত্যন্ত জনপ্রিয় এই শিল্পী। আধুনিক র‍্যাপ সংগীতকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি।
এদুজন ছাড়াও আরো আছে ‘উ টাং ক্ল্যান’, ‘নাস’, ‘জে জি’, ‘টুপাক শাকুর’, ‘রাকিম’, ‘বেস্টি বয়েজ’।

সুস্থ সংগীত শুনুন মানসিকভাবে সুস্থ ও পরিপূর্ণ থাকুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Bengali BN English EN Hindi HI